একা-বোকার রোজনামচা

পৌলমী গুহ

শহরে অনেক লোক ছিলো। বা অরণ্যে অনেক গাছ। তা সত্ত্বেও কারো কারো 'একা' লাগে। আধুনিক জন বলে দেবে, 'একা' লাগা আসলে একটা রোগ। ঠিক। একশোবার ঠিক। অথচ, একা লাগে বলেই বহুযুগ আগে এক কবি নিজেকে ভাসমান মেঘের মতো বলেছিলেন, একা লাগে বলেই মানুষের অনন্ত খোঁজ জারি থাকে। মানুষ একইসঙ্গে একা থাকতেও চায়, আবার চায়ও না।
পৃথিবী যখন মোটামুটি সুস্থ ছিলো, অন্য অনেক জীবন নষ্ট হলেও সমষ্টিগত মানুষের জীবনে তেমন কোনোও প্রভাব পড়েনি, সেই পৃথিবীতে স্বেচ্ছাযঠ¼ একাকিত্ব বেছে নেওয়া গেছিলো। অবশ্য à¦…à¦¨à¦¿à¦šà§à¦›à¦¾à¦¤à§‡à “ একা থাকার সংখ্যা কম নয়, কোনোও যুগেই।
তবুও একটি মহামারী, ছোট্ট একটুখানি ভাইরাস হঠাৎ সবাইকে গুটিয়ে-à¦ªà¦¾à Ÿà¦¿à¦¯à¦¼à§‡ ঘরের ভেতর পুরে দিলো। কেউ কেউ অবস্থাগতিঠ•ে একা হয়ে গেলো, কেউ ঠিক একা নয়, তবে বাইরের জীবন হারিয়ে পঙ্গু হয়েই গেলো। আর ঠিক তখনই মানুষ আবিষ্কার করে ফেললো, মানুষ আক্ষরিক অর্থেই 'একা'! জ্ঞানবৃক্ঠের ফল আস্বাদনের পর এমন কোনোও সত্য মানুষের ঘাতসহ বুক নেয়নি তা তো নয়, অতএব, এ সত্য আবিষ্কার করলেও মানুষ বদলে ফেলতে পারবে না। বাইরের খোল-নলচে পাল্টানো সহজ, কিন্তু অন্তর বলে যে খোপটা মাঝে মাঝে স্বার্থপর হয়ে ওঠে তাকে প্রবোধ দেওয়া কতো কঠিন তা স্রেফ একটি মহামারী বুঝিয়ে দিলো।

ভাবতে হয়তো হাস্যকর লাগবে, সঙ্গী নির্বাচন করলেও অন্যান্য প্রাণীদের মতো মানুষ পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারে না। কারণ প্রকৃতি যাইই করে থাকুন, মানুষকে বংশবৃদ্ধিঠজন্যই শুধু সঙ্গী নির্বাচনেঠসুযোগ দিয়েছেন তা আমরা মানতে নারাজ। সময়ে সময়ে নিজেদের নির্বোধ প্রাণী বলে মনে হওয়া অস্বাভাবিঠনয়! তাই আমরা বরাবর একা। 'জন্ম-একা' যাকে বলা চলে। দুঃখের বিষয় এই বোধ কোনোও শ্রেণিগত বৈষম্যের ওপর নির্ভর করে না। মানুষে মানুষে ব্যবধানের প্রাচীর সমাজের প্রতিটি শ্রেণিতেই অনেক গভীরে প্রোথিত। তাই সারাদিন খাটনির পর মাতাল স্বামীর হাতে লাঞ্ছিত নিম্নবিত্ত গৃহবধূ ও মাল্টিস্টৠরিডের উচ্চবিত্ত গৃহিণীর à¦à¦•à¦¾à¦•à¦¿à¦¤à§à¦¬à§‡à ° রঙ আলাদা হলেও, আখেরে তা একই ভাবে শূন্যতা আনে। মুঠোফোনে ডুবতে থাকা সমগ্র মানবসম্প্র দায় 'সম্পর্ক' শব্দটা অভিধান থেকে বাদ দিতে যাওয়ার সময়েই মহামারী এসে এতোদিনের মানচিত্র বদলে দিলো।
এ প্রসঙ্গে মনে পড়লো নির্মল বর্মার অসাধারণ উপন্যাস 'লাল টিন কি ছত্'। নির্মল বর্মার সিগনেচার স্টাইলে লেখা এই উপন্যাসের পটভূমি শীতের রুখু-সুখু সিমলা। আর প্রোটাগনিঠ¸à§à¦Ÿ কায়া ঋতুমতী হওয়ার আগে বয়ঃসন্ধির à¦¦à§‹à¦°à¦—à§‹à¦¡à¦¼à¦¾à¦¯à ¼ দাঁড়ানো কিশোরী।
পুরো উপন্যাস জুড়েই অদ্ভুত à¦à¦•à¦¾à¦•à¦¿à¦¤à§à¦¬à§‡à ° আবহ। পাহাড়ের শীতের রূপ, প্রকৃতির নিঃসীম à¦à¦•à¦¾à¦•à¦¿à¦¤à§à¦¬à§‡à ° মাঝে চরিত্রগুলৠর একাকিত্ব মিলেমিশে যায়। এখানে চরিত্ররা নিজেদের শীতার্ত অস্তিত্বকৠ‡ ভুলে যেতে সম্পর্কের ওম্ চায়, আবার ভেতরের সবটুকু প্রকাশ হয়ে যাওয়ার মুহূর্তে নিজেদের à¦à¦•à¦¾à¦•à¦¿à¦¤à§à¦¬à§‡à ° জগতে তাড়াতাড়ি ফিরেও আসে। সম্ভবত আধুনিক মানুষ এভাবেই নিঃসম্পর্ঠদর্শকের মতোই নিজস্ব সম্পর্কগুঠ²à§‹à¦•ে দেখে।
তাদের কাছে বসা যায়, কিছুটা সময় কাটানো চলে কিন্তু তারপর বুকের তন্ত্রীতে টান পড়লেও 'নিজস্বতা'-à¦à ° ধুয়ো টেনে সরে আসার চেষ্টা চলতে থাকে। না চাইলেও আমরা আদতে বিচ্ছিন্ন কিছু দ্বীপের মতোই জীবনযাপন করি। আমাদের যোগাযোগ হয়, দেখা হয়, অর্থহীন কথাও হয়। কিন্তু একত্রে থেকে যাওয়া হয় না, অথবা একত্রে থাকার মতো কোনোও বিষয় চাওয়া হয় না।

আর এই অভ্যস্ত দেখনদারির জীবনযাত্রঠর নিয়ম করোনা পরবর্তী পৃথিবী হয়তো বা কিছুটা হলেও পাল্টে ফেলবে।
চরম ব্যস্ত মা-বাবার সন্তানকে অবাক হতে বাধ্য করলো মহামারী, দেখালো বাড়িতে এই দু'টো লোক থেকে যাচ্ছে প্রায় সারাদিন। অফিসের কলিগ, বাইরের বন্ধু-বান্ঠব ছেড়ে নিভৃত গৃহকোণে ফেরা দম্পতিও চমকে গেলো বইকী! ফল অবশ্য সবক্ষেত্রৠ‡à¦‡ মিঠে হলো তা হলফ করে বলা চলে না। করোনার জন্য দায়ী রাষ্ট্রটিত ে গত ক'মাসের লকডাউনে বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যাই বলে দেয়, মানুষ 'একা' থাকতে পছন্দ করে, সঙ্গীর সঙ্গে যুদ্ধ করার চাইতে! মোটের ওপর বাধ্যত গৃহবন্দি জনজীবন à¦à¦•à¦¾à¦•à¦¿à¦¤à§à¦¬à¦•à ‡ সঙ্গী করে চলতে গিয়ে ছোটোখাটো বহু উপলব্ধির শরিক হচ্ছে। এবং অনেকেই 'সহ্যসীমা' অতিক্রম করলে চরম পথ বেছে নিতেও কসুর করছে না। চিকিৎসকরা এর আভাস আগেই à¦¦à¦¿à¦¯à¦¼à§‡à¦›à¦¿à¦²à§‡à ¨à¥¤ মানুষের মন যে আদতে ভঙ্গুর একটি জিনিস, তা নিয়ে তাঁরা শঙ্কিত হবেন এ তো বলাই বাহুল্য।
তবে স্বেচ্ছাযঠ¼ একাকিত্ব বেছে নেওয়া চরিত্রগুলঠও এই আকস্মিক বন্দিদশায় নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয়েছে, ঠিক কতোটা যুক্তিযুকৠà¦¤ একা বেঁচে থাকতে চাওয়া? যতোক্ষণ ক্ষমতা আছে দরজাটা খুলে বাইরের জীবনস্রোতৠ‡ ইচ্ছেমতো লিপ্ত হওয়ার হয়তো ততোক্ষণই 'একা' থাকার তাগিদ। কিন্তু এখন 'একা থাকুন' ভবিতব্য হয়ে যাচ্ছে যখন, মানুষের চিরকালীন প্রতিবাদী সত্ত্বা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে বাধ্য! একটি রোগের কাছে মাথা নত করে অসহায়ভাবৠমেনে নেওয়া ঠিক মনুষ্যধর্ম ে খাপ খায় না।
হয়তো সেকারণেই নিষেধাজ্ঞঠঅমান্য করেই কেউ কেউ বেরিয়ে পড়েছেন রাস্তায়। যাঁরা দীর্ঘকাল বাড়ির বাইরে থেকেছেন, তাঁদেরও আর ভালো লাগেনি একার জীবনযাপন। এ এক অদ্ভুত রহস্য।
পড়ে পাওয়া একাকিত্ব গলার ফাঁস হয়ে চেপে বসলো, সম্ভবত আরো একটি কারণ ওতপ্রোতভাঠ¬à§‡ জড়িত - তা হলো জীবন সম্পর্কীযঠ¼ অনিশ্চয়তঠ!

বাঙালি কবি এই মহামারীর মাঝে দাঁড়িয়ে কি স্পর্ধিত কলমে, প্রেমময় আবেগে নুয়ে পড়ে বলতে পারতেন, " এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ, / আমি কি এই হাতে কোনোও পাপ করতে পারি…"? যেখানে হাত হয়ে উঠছে নিজের ও নিজের প্রিয়জনদৠর মারণ বাণ, সেখানে হাত ও হাতের পাতা প্রিয়তমা তো বটেই, নিজের মুখখানিও ছোঁয়ার অনুমতি পাবে না। আর এই সামান্য পরিবর্তনই বদলে দিচ্ছে দূরত্বের সংজ্ঞা। পৃথিবী যে বিধ্বংসী মহামারীর অভিজ্ঞতা লাভ করেনি, তা তো নয়। কিন্তু চিকিৎসাবিঠ্ঞান, প্রযুক্তিঠএই রমারমাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই যুগে সেই বুড়ো আঙুলের চাপেই যোগাযোগ যখন পলক না ফেলিতেই সম্ভব, সেখানে আচমকা সামাজিক দূরত্ব পালনের অভ্যাস মোটের ওপর কঠিন তো বটেই!
রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে বাইরের আলো ঝলমলে পৃথিবীকে দেখে আক্রোশে ও আফশোসে ফুঁসে ওঠা মানুষ à¦à¦•à¦¾à¦•à¦¿à¦¤à§à¦¬à¦•à ‡ প্রাথমিকভঠবে ফলদায়ী বানাতে চাইলেও সেই ভাব দীর্ঘদিন ধরে রাখতে পারেওনি। হয়তো শিল্পীদের কাছে, চরম ব্যস্ততার জীবনে যাঁরা অভ্যস্ত তাঁদের কাছে এর গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু বাকিরা? বন্ধুমহল থেকে বিচ্ছিন্ন, এমনি সময়েও মুঠোফোনের স্ক্রিনে ডুবে পারিপার্শ্ বিক ভুলে থাকা লোকজনও একে ঠিক আশীর্বাদ বলে ভেবে উঠতে পারেননি বলেই মনে হয়। পাড়ার দোকান, বাসের কন্ডাক্টর, সবার জন্যেই প্রাণ কেঁদে উঠেছে সময়ে সময়ে।
তুলনামূলকঠ­à¦¾à¦¬à§‡ যাঁরা জীবিকার প্রয়োজনে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে থাকেন, তাঁদের এ ভাব কম। কারণ? আর্থ-সামাজঠ¿à¦• অবস্থা। দেশজুড়ে চলা আনপ্ল্যানঠলকডাউন পেটে টান ধরিয়েছে প্রথমেই। খিদের কাছে, বাড়িতে ফেরার অনিশ্চয়তঠর কাছে বাদবাকি বোধ তুচ্ছ।
রেললাইনে পড়ে থাকা রুটির ছবি, মরিচক্ষেতৠ‡à¦° শিশুশ্রমিঠের বাড়ি ফেরার চেষ্টায় অসহায় মৃত্যু, মৃতা মায়ের চাদর নিয়ে লুকোচুরি খেলা অসহায় শিশু নগ্ন সত্যিটা চোখের সামনে তুলে ধরেছে বারবার।
যখন আমরা সামাজিক দূরত্ব, দিন দিন বাড়তে থাকা একাকিত্ব, সুস্থ জীবনে ফেরার অনিশ্চয়তঠনিয়ে কবিতা লিখছি বা কফির টিন শেষ হলে পাবো কিনা, সিগারেট কেন ব্ল্যাকে বিক্রি হবে, মাংস অনলাইনে কিনে ঠকবো না তো ইত্যাদি জরুরি বিষয়ে মাথা ঘামাচ্ছি, এই দেশেরই একটা বৃহৎ অংশ বাহ্যত মৃত্যুর অপেক্ষায় দিন গোনা শুরু করেছে।
তারাও একাই। নিজেদের দাবি কেড়ে নিতে না পারার একাকিত্ব, নিজেকে 'মানুষ' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে না দেওয়ার একাকিত্ব, সামান্য ক'টা টাকার জন্য পরিবার স্বজন ছেড়ে শরীরপাত করেও এই মুহূর্তে ঘরে ফিরতে না পারার à¦à¦•à¦¾à¦•à¦¿à¦¤à§à¦¬à§‡à ° রঙ আমাদের সেলোফোনে মোড়া সুখী ড্রয়িংরুঠের হার্বাল টী-র শেডে একদম মানায় না।
তাই à¦à¦•à¦¾à¦•à¦¿à¦¤à§à¦¬à§‡à ° অনেকরঙা প্যালেট নিয়ে বসলেও বারবার ধূসর রঙ শেষ দান জিতে নিতে চায় -

" In the grey of the dawn; and myself
Will lay myself straight in my bed,
And draw the sheet under my chin."
- Adelaide Crapsey, 'The Lonely Death'.